সারারাত গুলিবিনিময় হলো- এ পক্ষেও খানসেনা ও পক্ষেও খানসেনাঃ সেমসাইড (দৈনিক বাংলা, ০৪ জানুয়ারি, ১৯৭২)

সারারাত গুলিবিনিময় হলো- এ পক্ষেও খানসেনা ও পক্ষেও খানসেনাঃ সেমসাইড (দৈনিক বাংলা, ০৪ জানুয়ারি, ১৯৭২)

[ দশ ]

।। হেদায়েত হোসাইন মোরশেদ প্রদত্ত ।।

 

সারারাত দু’পক্ষে তুমুল গুলি বিনিময় হলো। ভোর বেলা দেখা গেল ‘সেম সাইড’। এপক্ষেও খান সেনা ওপক্ষেও খান সেনা। দু’পক্ষে নিহতের সংখ্যা কমপক্ষে তিরিশজন। তারপর হানাদার পাক বাহিনীর সৈন্যরা যা করতো তারই পুনরাবৃত্তি হলো। জোক দেখাবার জন্যে দিয়ে দিল কার্ফু। রাস্তার পাশে বাড়ী বাড়ী তল্লাশী করলো। ঘরদোর তছনছ করলো। যে যা পারলো লুট করলো। দুয়েকজন মাথা ফাঁকা খান সেনা রাস্তার পাশের বাড়ীর লোকজনকে জিজ্ঞেস করলো- ‘হামলোগ তো গোলি চালায়া। শায়েদ তুম বোলো কিউ চালায়া?’

‘বিচ্ছুদের’ নেপথ্য কাহিনী (পৃষ্ঠা-১)

ঘটনাটি ঘটেছিল ঢাকার সায়েদাবাদ যাত্রাবাড়ী এলাকায় গত জুলাই মাসের শেষ সপ্তাহে। ইসলামী সেক্রেটারীয়েটের সেক্রেটারী জেনারেল জনাব ট্যুকু আবদুর রহমান তখন ঢাকা সফরে এসেছেন। মাদ্রাসা পরিদর্শন করছেন,  নৌবিহার করছেন, নৈশভোজ খাচ্ছেন, বড়ী বড়ী বাত পাড়ছেন। ‘উদ্বাস্তু’দের সাহায্য ও পুনর্বাসনের জন্যে হানাদার পাক সরকার কি ব্যবস্থা গ্রহণ করেছেন তা দেখার জন্যে তিনি চুয়াডাঙ্গা ও বিকরগাছা অভ্যর্থনা কেন্দ্রে যাবেন বলে ঘোষণা করেছেন। তাছাড়া, ঘূর্ণিঝড় বিধ্বস্ত লোকদের পুনর্বাসন প্রকল্পের অগ্রগতি দেখার জন্যে ভোলা ও পটুয়াখালি যাবেন বলে জানিয়েছেন। চারদিকে তিনি স্বাভাবিক অবস্থা দেখতে পাচ্ছেন। ছাত্র-ছাত্রীহীন নিষ্প্রাণ বিশ্ববিদ্যালয়; বিকেল না হতেই জনবিরল জিন্নাহ্‌ এভিনিউ ও সদরঘাট ঘুরে দেখে তিনি নগর পরিভ্রমণ করেছেন।

 

এমনি সময় হাটখোলা-যাত্রাবাড়ী রোডে এই সেমসাইড ঘটনাটি ঘটলো। ট্যুকু সাহেবের ভোলা ও বন্যাদুর্গত এলাকা সফর বাতিল হলো। এর আগে তিনি আর সাহস করে বিকরগাছা ও চুয়াডাঙ্গাও গমন করেননি। তাও বাতিল করা হয়েছিল। অবশ্য, উভয় ক্ষেত্রেই বলা হয়েছিল আবহাওয়া খারাপ।

 

এই সেমসাইড ঘটনা ঘটানোর নায়ক ছিল ঢাকায় কর্মরত ক্র্যাক প্লাটুনের চারজন গেরিলা। তাদের নাম পুলু, হানিফ, মোজাম্মেল ও বারেক। আর ছিল দিলীপ জর্দার কৌটার মতো দেখতে তিনটি মিনি মাইন। গেরিলাদের হাতে অস্ত্র ছিল একটি ৩০৩ রাইফেল ও একটি স্টেনগান।

 

ধলপুরে তখন পুলুদের ঘাটি। ওদের কাছে ছিল কয়েকটি মিনি মাইন। স্টেনগান, লাইট মেশিনগান, রাইফেল, রিভলভার, এসএলআর, হ্যান্ড গ্রেনেড ইত্যাকার অস্ত্র তারা এতদিন বিভিন্ন অপারেশনে ব্যবহার করেছে। শুধু এই ‘মিনি মাইন’ ব্যবহারের সুযোগ পায়নি। কিন্তু এই জর্দার ডিব্বার মতো জিনিসটা নাকি খুব কড়া। ট্রেনিং এর সময় খেলাঘর ক্যাম্পে তাদেরকে একবার কৌতুক করে বলা হয়েছিল- ‘সোফার কূশনের নীচে কোনভাবে ঐ ডিব্বাকে যদি লুকিয়ে রাখতে পারো আর বড় সাহেব এসে যদি সেই সোফায় বসেন তখন দেখবে বসতে না বসতে বড় সাহেব লাফিয়ে তেতলা অব্দি উঠে গেছেন। অবশ্য, এই মিনি মাইন বেশী ব্যবহৃত হয় প্রধানতঃ চলন্ত গাড়ী উল্টাবার জন্যে। কিন্তু ওদের কাছে সেই সুযোগও আসেনি। পুলি হানিফ’রা বললো – না, এমনি এগুলো ফেলে রাখার কোন মানে হয় না। জিনিসটির তেজ কতো একটু পরখ করা দরকার।

 

তারপর জুলাই’র শেষ সপ্তাহের এক রাতে তারা সায়েদাবাদ পুলের ওপাশে যাত্রাবাড়ী অভিমূখী রাস্তার উপর সেই মিনি মাইন তিনটি রেখে দিল। রাত তখন বারোটা। এরপর পাশের এক বাড়ীতে গিয়ে বসে থাকলো মিনি মাইনের তেলেসমাতি স্বচক্ষে দেখার জন্যে। যাত্রাবাড়ী রাস্তায় মাইন বসানোর আরো কিছু উদ্দেশ্য ছিল। ও রাস্তা দিয়ে হরদম মিলিটারী কনভয় যাতায়াত করছিল। এবং রাতে বিশেষ করে রাত দশটার পর সেনাবাহিনী বা তার সহযোগীদের গাড়ী ছাড়া অন্য কোন যানবাহন ওপথে চলাচল করে না। এছাড়া, সায়েদাবাদ পুল ও যাত্রাবাড়ী চৌরাস্তার মধ্যবর্তী এক জায়গায় রয়েছে হানাদার সেনাদের একটি ক্যাম্প ও চেকপোস্ট। জর্দার ডিব্বার বাজনা ওদেরকেও শোনান যাবে।

 

রাত একটা বেজে গেল কিন্তু কোন গাড়ীরই পাত্তা নেই। সোয়া একটা, দেড়টা, পৌনে দুটা বেজে গেল। গাড়ীর দেখা নেই। ওরা ভাবলো, দূর চলেই যাই। খান সেনাদের গাড়ীগুলো বোধ হয় স্ট্রাইক করেছে। তারা উঠে চলে আসবে এমন সময় দেখা গেল যাত্রাবাড়ীর দিক থেকে আসছে দু’জোড়া হেড লাইট। সামনের গাড়ীর চেয়ে পেছনের গাড়ীর দূরত্ব প্রায় পঞ্চাশ-ষাট গজ। খানিক পরেই প্রচন্ড বিস্ফোরণের শব্দ। সামনের গাড়ীটি ছিল খানসেনা ভর্তি এক মিলিটারী লরী। ছিটকে গিয়ে উলটে পড়লো পাশের নীচু জলাভূমিতে। গতির ভারসাম্য হারিয়ে পেছনের গাড়ীটিও সুরুত করে একই পথের যাত্রী হলো। ওটাও ছিল খান সেনা বোঝাই একটি লরী।

 

লরীর নীচে চাপা পড়া খান সেনারা চিল্লাচ্ছে। ভিজে জবজব সেনারা রাস্তায় ওঠার কসরত করছে এমন সময় যাত্রাবাড়ী মিলিটারী চেকপোস্ট থেকে ঝাঁক বেঁধে ছুটে এলো এলএমজি’র গুলি। ওরা ভেবেছে, – ওখানে ‘মুকুত লোগ’ এসে কান্ডকারখানা শুরু করে দিয়েছে। উলটে যাওয়া লরীর খান সেনারাও পজিশন নিয়ে নিল। ওরা ভাবলো, মুক্তি বাহিনী গুলি করছে। ব্যাস শুরু হয়ে গেল খান সেনাদের নিজেদের মধ্যে গুলি বিনিময়।

 

কিছুক্ষন চলার পর দু’পক্ষে যখন গুলিবর্ষণ ক্ষান্ত হলো তখন শুরু হলো গেরিলাদের কান্ডকারখানা। সেই বাড়ীর বারান্দা থেকে তারা আকাশে ছুড়ে দিল কয়েকটি স্টেনের গুলি। ব্যাস আবার শুরু হলো হ্যাসাম। সায়েদাবাদ পুল ভাবল, মুক্তিবাহিনী গুলি করছে যাত্রাবাড়ী থেকে। যাত্রাবাড়ী পুল ভাবলো, মুক্তিবাহিনী গুলি করছে সায়েদাবাদ থেকে। চললো সেমসাইড গুলি বিনিময়। এমনিভাবে চলতে লাগলো খানসেনাদের খেল। রাত চারটার দিকে গেরিলারা চলে এলো। গুলি চললো দু’পক্ষে ভোর অব্দি। ভোরে হাটখোলার দিক থেকে এবং ডেমরার দিক থেকে এলো ভারী ভারী মাল-সামান নিয়ে খানসেনাদের আর্টিলারি বাহিনী। পরে দেখা গেল ওটা ছিল সেমসাইড। ভোর থেকে বিকাল অব্দি হাটখোলা মোড় থেকে যাত্রাবাড়ী চৌরাস্তা পর্যন্ত কার্ফু দেয়া হলো। মুকুত বুজতে লাগলো খানসেনাদল।

‘বিচ্ছুদের’ নেপথ্য কাহিনী (পৃষ্ঠা-২)

পত্রিকার জন্য কৃতজ্ঞতা: Center for Bangladesh Genocide Research (CBGR) এবং International Crimes Strategy Forum (ICSF)।

Leave a Reply