রামগতির দামাল ছেলেদের প্রতিরোধের একটি কাহিনী (দৈনিক বাংলা, ০৪ জানুয়ারি, ১৯৭২)

– কামালউদ্দীন আহমদ

 

হাটে কারফিউ, বাজারে কারফিউ, পথ, ঘাট আর মাঠেও কারফিউ। অবশেষে কারফিউ তার ভয়াল ডানা মেলেছিলো নদী নালা আর খাল-বিলেও।

দখলদার বর্বর বাহিনী আর তাদের পদলেহী রাজাকারেরা গোটা বাংলাদেশকেই যখন তাদের নির্মম ছোবলে ছোবলে ক্ষত বিক্ষত করছিলো, রামগতি হাতিয়ার ন্যায় বন্যা বিধ্বস্ত স্থানগুলোও তাদের সে রক্তাক্ত আঘাত হতে নিস্কৃতি পায়নি। জুলাই মাসের ৩ তারিখে রামগতি দু জাহাজ বোঝাই খান সেনার উপস্থিতির সঙ্গে সঙ্গে এ চরাঞ্চলের জুলাইর মেঘলা আকাশ বাতাস কেমন যেনো এক অজানা আতঙ্কে থমথমে হয়ে উঠলো। খান সেনাদের ভারী বুটের পেষণে কারো প্রাণ গেলো, লোনা মেঠোপথ রক্তে লাল হয়ে গেলো স্বয়ংক্রিয় রাইফেলের গুলিতে, ধর্ষিতা মা আর বোনের অসহায় কান্নায় আকাশ বাতাস হলো ভারাক্রান্ত। গ্রামের পর গ্রাম, চরের পর চর পুড়ে ছাই করে দিলো বর্বর হানাদার পশুগুলো।

জুলাই মাসের ৭ তারিখ হতে ১৭ তারিখ-এর মধ্যে কয়েক শত রাজাকারকে ট্রেনিং দেয়া হলো রামগতি থানায়। এরা অনেকেই মাদ্রাসার ছাত্র। তারপর পুরো জুলাই আর আগস্ট মাস খানসেনা ও তাদের পোষারা আরো কয়েকশত রাজাকার তৈরী করলো। এদেরকে হাতে কলমে মানুষ মারা শিখিয়ে দেয়া হলো, শিখানো হলো কি ভাবে লুঠ, ধর্ষণ করতে হয়। হ্যাঁ, এদেরকে আর একটি কাজ বিশেষ করে শিখানো হলো, আক্রান্ত হলে কত সহজে এবং কত তাড়াতাড়ি রাইফেলের বোল্ট খুলে ফেলতে হয়, যাতে রাইফেল যদি তাদের শত্রুদের হাতে চলেও যায় বোল্টের অভাবে যেনো অকেজো হয়ে পড়ে। আগস্টের শেষের দিকে খান সেনাদের একটা অংশ অন্যত্র চলে গেল বটে কিন্তু জন পঞ্চাশেক রয়ে গেলো রাজাকারদের ঠিক পথে পরিচালনা করার জন্যে।

রামগতি জায়গাটি উত্তর-দক্ষিণে ২৩/২৪ মাইল লম্বা কিন্তু পূর্ব-পশ্চিম পাশ মাত্র ৬/৭ মাইল। এরই মোটামোটি মাঝখান দিয়ে উত্তর দক্ষিণে ওয়াপদা ও জেলা পরিষদের রাস্তাটি চলে গেছে। এ পথের পাশে গড়ে উঠেছে হাট-বাজার আর রাজাকারদের শিবির বসলো রামগতি, বিবিরহাট, চর আলেকজান্ডার জমিদারের হাটের ইসলামিয়া মাদ্রাসা, হাজিরহাট, তোরবগঞ্জের করইতলা, রামদয়ালের বাজারে। রাজাকারদের অভিভাবকরূপে ২৫ জন পাঞ্জাবী রইলো রামগতি থানায়, ২৫ জন রইলো হাজিরহাটে। রাজাকারদের থানা কমান্ডার হলো জনৈক রফিক। তার ক্যাম্প ছিলো করাইতলা, কিন্তু যে দিন তারা সেখানে ক্যাম্প করলো, প্রথমে সে আদেশ দিলো আজ হতে করাইতলা আমার নামানুসারে রফিকপুর বলে পরিচিত হবে, যে এ আদেশ অমান্য করবে তাকে ৫০০ টাকা জরিমানা দিতে হবে আর ২৫ ঘা বেতের আঘাত সইতে হবে। এ বুঝি বর্বর টিক্কারই প্রতিবিম্ব। রফিকের আদেশ কে অমান্য করে? যদি ভুলেও কেউ রফিকপুর না বলে করইতলা বলেছে, রামগতির শাসক রফিক অবশ্যই তা জেনেছে। এমন দুস্কৃতিকারীদের কেসে শুধু বেত-দন্ড নয়, মৃত্যুদন্ডও দিয়েছে।

সেপ্টেম্বর আর অক্টোবর মাসে রাজাকারদের নির্যাতন এক চরম আকারে দেখা দেয়। কথায় কথায় ওরা গুলি চালায়, হাজিরহাটের আজু পাটারীকে নির্মমভাবে হত্যা করলো তার ছেলে শাহজান মুক্তিবাহিনীতে যোগ দিয়েছে এ অপরাধে, হত্যা করলো মুক্তিবাহিনীর আবুল কালামের বৃদ্ধ পিতাকে, করুণানগরের মনিন্দ্র বাবুর বয়স নব্বই বছরের বেশী তাকেও একই অপরাধে গুলি করে নদীতে ভাসিয়ে দিল বর্বর পশুরা। কালুবাঘাকে মেরে তার নয় হাজার টাকা ওরা আত্মসাৎ করলো, শত শত বাড়ী পুড়ে ছাই করলো, তথাকথিত মৌলনারা লুট করাকে, ধর্ষণ আর খুনকে ইসলামের অবশ্য করণীয় বলে ফতুয়া দিলো যে রাজাকার যতজন মানুষ খুন করতে পারবে সে ততটা স্বর্গ লাভ করবে। এ চাঞ্চল্যকর ফতুয়ার প্রাপ্যও নরুল আলম পেয়েছে। থানা কমান্ডার রফিক যখন বিচ্ছুদের হাতে ধরা পড়ে তখন তার থানা কমান্ডার পদে উন্নতি হয়েছিলো।

রফিক ও তার রাজাকারেরা নৃশংসতার এমন চরম পর্যায়ে নেমে এসেছিলো যে তারা ৭ (সাত) দিনের নবজাতকের প্রাণ কেড়ে নিতেও ইতস্ততঃ করেনি। এ ঘটনাটি ঘটেছিল চরপাগলার আবু হাওলাদারের বাড়ীতে।

অক্টোবর মাস চরাঞ্চলের জন্যে বড় অভাবের সময়। গেলো সর্বনাসা বন্যায় এ অঞ্চলের পাঁজরভাঙ্গা মানুষগুলো সামান্য সাহায্য সামগ্রী পেতো। কিন্তু এবার রফিকদের চোখ পড়লো সেদিকে। ৬ নং চরবাদাম ইউনিয়নের তখনকার চেয়ারম্যান এর নিকট কিছু টাকা আর গম এলো। অবশ্য এর বড় অংশ আগেই তথাকথিত শান্তি কমিটির দালালেরা আত্মসাৎ করেছে। সামান্য যা ইউনিয়নে এলো অক্টোবরের ৯ তারিখে রফিক তার দলবল নিয়ে এসে প্রতি রাজাকারের জন্যে দাবী করলো ২৫০ টাকা আর ৫ মন করে গম। চেয়ারম্যান ইমান আলী পন্ডিত পড়লেন মহা ফাঁপড়ে। তিনি প্রথমে আধমন করে গম নিতে রাজাকারদের অনুরোধ করলেন, কিন্তু এইসব কুটক্রিদের হাতে তখন রাইফেল। রক্তচক্ষু দেখিয়ে তারা পন্ডিত সাহেবকে বললো হয় তাদের কথা রাখতে হবে, অন্যথা তার চরম সর্বনাশ করা হবে। দিন ঠিক হলো ১১ই অক্টোবর সোমবার সকালে ওরা আসবে, তাদের দাবীমত টাকা আর গম নিতে।

চরবাদাম ইউনিয়ন কাউন্সিল হতে ৫/৬ মাইল উত্তরের চরে ছিলো তখন মুক্তিবাহিনীর গোপন শিবির। গোপনে রাতের আধারে এ এলাকার কয়েকজন জেলে, দিনমজুর আর কয়েকটি স্কুল-কলেজের ছাত্র সামান্য চাল, আটা আর জ্বালানী কাঠ নিয়ে আসতো। মুক্তিবাহিনীর শিবিরে সে রাতেই এ খবর তারা দিলো। আর একথাও তারা জানালো যে যদি গম আর টাকা রাজাকারেরা নিয়ে যায় তবে এ অঞ্চলের গরীব মানুষগুলোকে একেবারে না খেয়ে মরতে হবে।

বুঝি এমনি একটি খবরের আর সুযোগের অপেক্ষায় ছিলো মুক্তি-পাগল সংগ্রামী দামাল ছেলেরা। তারা ১০ তারিখ রাতেই আন্তারচরের শিবির ছেড়ে অতি গোপনে যে জমিদারের হাট হতে বর্বর পশুর গম নেবার কথা তার সামান্য উত্তরে যে দিক হতে ওরা আসবে সেখানে রাস্তার পূর্ব দিকে গোপনে ওৎপেতে বসে থাকলো দুটি বাড়ীতে। দু’বাড়ীতেই ঢুকার পর বাড়ীর সব লোকজনের চলাচল ওরা নিষিদ্ধ করে দেয়। দু বাড়ীর দুরত্ব প্রায় ৫০০ গজ। বাড়ী দুটোর পশ্চিম দিকে উত্তর দক্ষিণে রাস্তা চলে গেছে এবং রাস্তার মাঝামাঝি জায়গায় একটা টেলিফোনের পোস্ট আছে। মুজিববাহিনীর টিম লীডার তাহের তার দল নিয়ে উত্তরের বাড়ীতে, আর বেঙ্গল রেজিমেন্টের নূরন্নবী রাস্তাটি রেকি করে। দু অধিনায়কের ভেতর ঠিক হলো, তাহের অতর্কিত আক্রমণ করবে ঠিকই কিন্তু হিট এন্ড রান পদ্ধতি এখানে প্রয়োগ করবে না যদিও গেরিলারা তাই বেশী করে থাকে। এখানে তারা পুরো লড়াই করবে। আর উত্তর দিক হতে আক্রান্ত হয়ে যখন দস্যুরা দক্ষিণে পালাতে চেষ্টা করবে তখন নূরুন্নবীর দল তাদের নিশ্চিহ্ন করে দেবে। দুদিক হতে পশ্চিমের রাস্তার উপর ক্রস ফায়ারিং হবে।

গভীর আগ্রহ আর উৎকন্ঠার মধ্যে ওদের রাত শেষ হলো, আসলো সেই ১১ই অক্টোবরের সোমবার দিনটি। সকাল ১০টা এগারোটা বেজে গেলো, দুপুর বারোটা নাগাদও রাস্তায় কোন রাজাকার বাহিনীর হদিস নেই, উত্তর দক্ষিণে দু দুটো ক্যাম্পে পাঞ্জাবী হানাদাররা রয়েছে, তাদেরও কোন চলাচল নেই। স্বাধীনতা সংগ্রামীরা ভোরে নাস্তা করেনি, দুপুরে খাবারও ব্যবস্থা হয়নি। ওরা শত্রু নিধনের নেশায় ছিলো বিভোর কিন্তু কোথায় তাদের শত্রুরা। এমনি সময় তাহেরের ও পি খবর দিলো আল-বদরের কুখ্যাত গুন্ডাবাহিনী আসছে অনেকগুলো রিকশায়। তাহেরের দলের ওহাব আর নূরন্নবীর জয়পাল মহা সমস্যায় পড়লো এল এমজির ক্রসে হতভাগা নির্দোষ রিকশাচালকগুলোকে রক্ষা করা নিয়ে। একটি রিকশাচালক শহিদ হলো, আর রাস্তার উপরে পড়ে গেলো একশটি রাজাকারের লাশ। চারটি রাজাকারকে ধরলো তারা অক্ষত অবস্থায়। ১২-৪০ মিনিট হতে ১টা পর্যন্ত চলেছিলো এ লড়াই। মুক্তি বাহিনীর সাহসী সেনারা থাকতো নদী পার হয়ে চরে। তাদের চলাচল বন্ধ করার জন্যে হানাদারেরা কারফিউর কড়াকড়ি শুরু করেছিলো অক্টোবরের প্রথম হতেই। এমন কি এ দস্যুরা নদীতে পর্যন্ত কারফিউ দিয়েছিল। সাধারণ কৃষক শ্রমিক পর্যন্ত দিনে রাতে ঘর হতে প্রায়ই বের হতে পারতো না। কারফিউর সময় ওরা যাকে রাস্তায় এমনকি ঘরের বাইরে পেতো তাকে নির্মমভাবে গুলি করে হত্যা করতো। শত্রুদেরকে নির্মূল করে তাদের অস্ত্রগুলো কেড়ে নিয়ে চলে এলো মুক্তি বাহিনী। দস্যুরা যাদের মুখের অন্য কেড়ে নেবার জন্যে যে গরুর গাড়ী এনেছিলো সেগুলো ভর্তি করে তাদের শিবিরে নেয়া হলো তাদেরই রক্তাক্ত ঘৃণিত মরদেহ।

মুক্তি বাহিনীর কৃতিত্বে মনমরা মানুষেরা সবাই উচ্চ গলায় চিৎকার করে উঠলো জয় বাংলা বলে। কাঁপতে কাঁপতে জয় বাংলা শব্দ প্রতিধ্বনিত হতে লাগলো দিগন্তে দিগন্তে। এ জয় বাংলা বুঝি কারফিউ হয়ে কাজ করলো রামগতি থানায় ৩৫০/৪০০ কুখ্যাত বদর বাহিনীর ৬টি শিবিরে। এর পর আর বড় একটা কেউ তাদেরকে রাস্তায় দেখেনি।

রামগতির দামাল ছেলেদের প্রতিরোধের একটি কাহিনী

পত্রিকার জন্য কৃতজ্ঞতা: Center for Bangladesh Genocide Research (CBGR) এবং International Crimes Strategy Forum (ICSF)।

Leave a Reply