রাজাকার আর মিলিটারীরা গলায় দড়ি বেঁধে হেলেনা আপাকে মেরে ফেলেছিল (দৈনিক বাংলা, ০৩ জানুয়ারি, ১৯৭২)

রাজাকার আর মিলিটারীরা গলায় দড়ি বেঁধে হেলেনা আপাকে মেরে ফেলেছিল (দৈনিক বাংলা, ০৩ জানুয়ারি, ১৯৭২)

মাহফুজুল হক

অধ্যাপক, মাগুরা মহাবিদ্যালয়

‘ঐ একখান জয় বাংলা, আরাকখান জয় বাংলা’। যশোর জেলার মাগুরা শহর। শহরের বুক চিরে কলেজ রোডটি গিয়ে সোজা উত্তর-দক্ষিণে সরল রেখার মত বিস্তৃত হয়ে ঢাকা রোডের সাথে মিশেছে। মাগুরা মহাবিদ্যালয়ের প্রান্ত ঘেঁষেই গিয়েছে।

২০শে ডিসেম্বরের সকাল সাড়ে সাতটায় মুক্তিবাহিনীর দু’জন গেরিলা বগলে স্টেনগান ঝুলিয়ে কলেজ রোড হয়ে মহাবিদ্যালয়ের পাশ দিয়ে ঢাকা রোডের দিকে যেতে যেতে এক ঝাঁক নানা বয়সের ছেলেমেয়েকে হিমেল ঊষার বুক চিরে আত্মপ্রকাশকারী সূর্যের সোনালী মিষ্টি রোদে সড়কের উপর দিয়ে ছুটাছুটি করতে দেখল।

ওরা দু’জন চলেই যাচ্ছিল। ওদেরকে থামিয়ে ছাড়ল আড়াই বছর/ তিন বছর বয়সের একটি ছেলের আলতো মিষ্টি চিৎকার ‘ঐ একখানা জয় বাংলা, আরেকখান জয় বাংলা’। হাশেম (গেরিলা) ছেলেটির কাছে গিয়ে তাকে কোলে তুলে নিল। আদর করতে করতে জিজ্ঞেস করল ‘তোমাদের কোন বাড়ী?’ ও হাত দিয়ে কলেজের উত্তর প্রান্তে লাগোয়া বাড়ীটা দেখিয়ে না দিতেই সবগুলি ছোট ছেলেমেয়ে একসাথে বলে উঠল ‘উ’ যে, উ’যে (ঐযে থেকে উইয়ে, তার থেকে উ’যে আঞ্চলিক ভাষা)।

হাশেম- তোমার নাম কি?
ছেলেটি আধো আধো স্বরে বলল, দিলীর।
হাশেম- তোমার আব্বার নাম।
ও চুপ করে থাকল।

ছেলেমেয়েদের মধ্য থেকে ১৩/১৪ বছরের একটা ছেলে (আসহাব) বলে উঠল- ‘ওর আব্বার খোঁজ নেই। ওর মা হেলেন আপাকে রাজাকার ও মিলিটারীরা মারে ফেলিছে’।
হাশেম আর তার সহকর্মী অসিতকে বেশ কিছুক্ষন পথের মাঝেই দেরী করতে হল।
হাশেম- ওর আব্বার নাম?
আসহাব- আলী কদর সাহেব।
হাশেম- তিনি কি করতেন?
আসহাব- গ্রাম্য এক হাইস্কুলের হেড মাস্টারি।
হাশেম- হেলেনা আপা কি করতেন?
আসহাব- মাগুরা গার্লস স্কুলের শিক্ষয়িত্রী ছিলেন। তিনি গ্রাজুয়েট ছিলেন, খুব ভাল পড়াতেন।
হাশেম- হেলেনা আপাকে পশুরা কিভাবে মেরেছিল?

আসহাব- ‘হেলেনা আপাগোর বাড়ীতে মিলিটারী, রাজাকার, পাক পুলিশ দুই দুই বার হামলা চালায়। প্রথম বারে উনাদের বাড়ীর সকলেই পালায়ে উত্তরে এক গ্রামে চলে যান। শত্তুররা উনার বড়, মেজে, সেজে ও নোয়া ভাইকে ধরতি আইছিল। সেদিন ছিল ১২ই জুন। মাস খানিক পর উনি, উনার আব্বা-মা, তিন বোন, নোয়া ও ছোট ভাই বাড়ী ফিরে আসেন। বড় তিন ভাই নিখোঁজ থাকেন। শত্তুররা উনার নোয়া ভাই দাদুকে ফিরে আসার ২ দিন পর রাস্তাত্তে ধরে নিয়ে বন্দী করে এবং মারতি মারতি ফিট করে ফেলে। জ্ঞান ফিরে পায়ে তিনি পানি খাতি চান। ইসলামী ছাত্র সংঘের ছেলেরা তার সামনেই পেসাব করে গ্লাসে ধরে তাকে খাতি বলে। রাট দশটায় নাকি তারে গুলি করার কথা ছিল। দাদু ভাই খুব চালাক ছেলে। কিভাবে যেন তিনি হাজততে পালায়ে নিখোঁজ হয়ে যান। উনার আব্বারেও এক রাত্রি রাজাকাররা মারে ফেলানোর জন্যি ধরে নিয়ে গিছিল। কিন্তু কেন যেন কি ভাবে বুড়ো মানুষটারে মারে ধরে ছাড়ে দিছিল।

আঠারোই আগস্ট শত্তুররা হেলেনা আপাগোর বাড়ীতে আবার হামলা করে। তার ভাইগোর কারুরে না পেয়ে ওরা হেলেনা আপা আর তার দুই বয়স্কা বুনরে ধাওয়া করে। ওরা পালিয়ে যান। কিন্তু হেলেনা আপা পালিয়ে যায়েও শেষ রক্ষা পালেন না। অক্টোবরের ৩ তারিকি বাবুখালি ইউনিয়নের এক গিরাম্মেতে রাজাকাররা তারে ধরে আনে। হেলেনা আপা দিলীররে কোলের মধ্যি সারে কুশরের ডুর মধ্যি পালাই ছিলেন। তবু জানোয়াররা তারে ধরে আনে। টাউনি আনে তারা চারে জামাতের মাহবুব মৌলবীর বাড়ীর মধ্যি শ্বাস বন্ধ করা এক খুপরির মধ্যি আটকায় রাখে। দিলীরও তার সাথে বন্দী থাকে। হেলেনা আপার আব্বা শান্তিকমিটির সগলির কাছে যায়ে কাঁদিচ্ছেলেন। কিন্তু ফল হয়নেই। হারামজাদারা হেলেনা আপার আঙ্গুলগুলো ইটের উপর রাখে ইট নিয়ে বাড়োয়ে বাড়োয়ে ভাংগিছিল। কিন্তু হেলেনা আপা বড় কঠিন মেয়ে ছেলেন। জল্লাদরা তার স্বামী বা ভাইদের সম্পর্কে এটা কথাও বার করতি পারছিল না। তার উপর আরো কত রকম জুলুম করিছিল। হেলেনা আপার আব্বারে শান্তি-কমিটির নেতারা দয়া করে একদিন হেলেনা আপারে দেখতি দিছিল। হেলেনা আপা কোন কথা কতি পারেন না। শুকনো পাটখড়ির মত হয়ে গেছেলেন। চোখ দিয়ে বর্ষার পানির মত পানি পড়ছিল। তখনেত্তে হেলেনা আপার আব্বা কেমন যেন হয়ে গেছেন।

রাজাকার আর মিলিটারীরা দড়ি গলায় বান্ধে দুই পাশেত্তে টানাটানি করে হেলেন আপারে মারে ফেলিছিল। তারপর হাত-পা বান্ধে কুমার নদীতি ফেলে দিছিল। কিন্তু হেলেনা আপারে মারে ফেলার পর দিলীররে তারা দয়া করে ওগোর বাড়ী পাঠায় দিছিল। সে তখন শুকোয়ে কাঠি হয়ে গেছে।

হেলেনা আপা পাকিস্তানের কবর আর স্বাধীনতার সূর্যা না দেখলি কি হয়, দিলীর, আমরা, যারা বাংলাদেশে বাঁচে আছে, তারাত দেখলাম’।
শেষ কথাগুলো এক দমে বলে আহসাব একটা গভীর পাতরো ছেদা নিঃশ্বাস ত্যাগ করল।
অসিত ডাইরিতে সব টুকে নিচ্ছিল। কথা ও টোকা যখন শেষ হয়েছে তখনও ওদের চোখে জলের ঝাপসা। ডাইরির লেখাও জায়গায় জায়গায় অশ্রুর সংমিশ্রণে অস্পষ্ট হয়ে গেছে।

দিলীরকে প্রাণের উত্তাপে আদর করে হাশেম ওকে কোল থেকে নামিয়ে হেলেনা আপাদের বাড়ীর দিকে একবার সকরুণ দৃষ্টি হানল, অসিত আর ও সামনে পা বাড়ালো। ওদের হৃৎপিন্ড মথিত করে তখন দুটো পাঁজর কাঁপানো দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল আর সজল চোখ ভেদ করে দুই জোড়া সূর্য্য দগ দগ করে উঠল।

রাজাকার আর মিলিটারীরা গলায় দড়ি বেঁধে হেলেনা আপাকে মেরে ফেলেছিল

রাজাকার আর মিলিটারীরা গলায় দড়ি বেঁধে হেলেনা আপাকে মেরে ফেলেছিল

পত্রিকার জন্য কৃতজ্ঞতা: Center for Bangladesh Genocide Research (CBGR) এবং International Crimes Strategy Forum (ICSF)।

Leave a Reply