বেগম মুজিবের বিষাদঘন দিনগুলোর কয়েকটি কথা (দৈনিক বাংলা, ০৪ জানুয়ারি, ১৯৭২)

বেগম মুজিবের বিষাদঘন দিনগুলোর কয়েকটি কথা (দৈনিক বাংলা, ০৪ জানুয়ারি, ১৯৭২)

স্টাফ রিপোর্টার

 

গত ডিসেম্বরের ঢাকা। কারফিউ ব্লাক-আউট, বেপরোয়া ধরপাকড় আর বদর বাহিনীর নৃশংস হত্যালীলার এক বীভৎস ইতিহাস ক্লান্ত করে দিয়েছিল রাজধানীর নাগরিক মন। পহেলা ডিসেম্বর থেকে ষোল তারিখের পূর্ব পর্যন্ত। স্রোতের মতই ভয়ার্ত মানুষ নেমেছিল পথে, খুঁজেছিল একটুকরো নিরাপদ আশ্রয়।

ভয়ার্ত এসব মানুষের স্রোতে আমিও আশ্রয় নিয়েছিলাম ধানমন্ডির আঠার নম্বর রোডের একটি বাড়ীতে।

আমার সেই কয়েকদিনের আশ্রয়স্থল থেকে মাত্র দু’টো বাড়ী পরে স্পষ্ট দেখতে পেতাম দুর্গের মত সুরক্ষিত কয়েকটি বাড়ী। গেটের দু’পাশে দুটো রক্ষাব্যূহ। যার গায়ে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ছিদ্র দিয়ে দেখা যেত কয়েকটি হেলমেট পরা হানাদার সৈন্যের গতিবিধি। নৃশংস একজোড়া চোখ মেলে ওরা কখনও কখনও এদিক ওদিক তাকাতো। ঘৃণিত এক পশুর মত হৃদয়হীন সে চোখের দৃষ্টি। ছাতের পরে সারি সারি বালির বস্তা আর কাদা ও ইটের দ্বারা গড়া হয়েছিল ঠিক রক্ষাব্যূহ। সেখান থেকে সৈন্যদের গতিবিধির চেয়েও মেশিনগানের উদ্ধত নলটাকে বেশী করে দেখা যেত। বাড়ীটাতে ওরা পাঁচটি সুদৃঢ় বিবর ঘাঁটি গড়ে কামান উঁচিয়ে থাকতো।

অতি সুরক্ষিত বাড়ীটার দিকে তাকালেই মনে পড়ে যেত বাংলার অতি আদরের দুলালকে বঙ্গবন্ধুকে। কোথায় কোন অজ্ঞাত কারাগারে তাকে বন্দী করে রেখেও নরপিশাচরা স্বস্তি পায়নি – কড়া পাহারায় বন্দী করে রেখেছে তার প্রিয়তমা পত্নী এবং আদরের সন্তানদের।

আজ মুক্ত বাংলা। মুক্ত হয়েছেন বেগম মুজিবও। তবুও বঙ্গবন্ধু ফিরে না আসা পর্যন্ত তিনি সেই কয়েদখানায়ই রয়েছেন। নববর্ষের দিন সূর্যের আলোয় পথ চিনে এগিয়ে গেলাম আঠার নম্বর রোডের দুর্গসদৃশ সেই বাড়ীটির দিকে। বাইরের ঘরেই বসেছিলেন বেগম শেখ মুজিব। হাসি মুখেই আহ্বান জানালেন আমাকে। বাড়ীটার উল্লেখ করতেই হেসে বললেন – এটাতো তবুও একটা মাথা গুঁজবার ঠাঁই, কিন্তু ২৫শে মার্চের পর পুরো দেড় মাস তাও কোথাও পাইনি। আজ এখানে কাল সেখানে, এমনি করে সেই দেড় মাসে কম করেও চোদ্দ পনেরটা বাসা বদল করেছি কিন্তু কোথাও মাথা গুঁজবার ঠাঁই পাইনি।

বেগম মুজিব ও তার কনিষ্ঠা কন্যা

হাসছিলেন বেগম মুজিব, কিন্তু দেখলাম হাসির মাঝে কেমন জানি অস্পষ্ট এক বিষ্ণণ্ণতার ছোয়ায় করুণ হয়ে উঠেছে তার চোখের দৃষ্টি।

পঁচিশে মার্চের সেই ভয়াবহ রাত। অন্ধকার শোবার ঘরটাতে বিছানায় শুয়ে শেখ সাহেব শুনেছিলেন বাইরের বোমা বিধ্বস্ত ঢাকার আর্তনাদ। উত্তেজনায় এক এক সময় উঠে বসছিলেন তিনি। ঠিক এমনি এক মুহূর্তে গুলির একটি টুকরো জানালা ভেদ করে খাটের পায়ের কাছের পায়া ভেদ করে ছোট ছেলে রাসেলের পায়ে আস্তে করে লাগে। অন্ধকারে হাতড়ে গুলিটা কুড়িয়ে নিয়েছিলেন শেখ সাহেব। আর সেই দুঃসহ রাতেই নরপিশাচরা তাকে বন্দী করে নিয়ে গিয়েছিল। বাড়ীতে তখন ছিলেন বেগম মুজিব আর তার দুই পুত্র।

২৬শে মার্চ – সমস্তটা দিন ছিল কারফিউ। গোলাগোলির শব্দ তখনও থামেনি। নিস্তব্ধ বাড়ীটা জুড়ে যেনো এক ভৌতিক বিভীষিকা মাথা খাড়া করে উঠেছে। সামনে ধানমন্ডি বালিকা বিদ্যালয়ে ফিট করে রাখা বড় বড় কামানের মুখগুলো একেবারে আমার বাসার দিকে। ভয়ে জানালাগুলো পর্যন্ত বন্ধ করে দিতে পারিনি। দুপুরে কার্ফুর মধ্যেই এবাসা ওবাসা করে বড় ছেলে কামাল এসে পৌছালো। নীচের ঘরে তখনও কয়েকটি ভলেন্টিয়ার ছেলে ছিল। সকলের জন্য কোন রকম ভাত ডাল রান্না করার জন্য বাবুর্চিকে বললাম, কিন্তু মন আমার রাতের কথা ভেবে অবশ হয়ে আসছিল। এর আগে বহুবার শেখ সাবেব বন্দী হয়েছেন, কিন্তু এবারের মত অত বীভৎস লাগেনি তার অবর্তমানে নিজেদের অবস্থা।

রাত এলো। সেই আঁধার কালো রাত। ইয়াহিয়া খানের সেই হিংস্রভাবে চিকিয়ে চিকিয়ে বলা বিবৃতি শুনে এক-কথাতেই নিজেদের অবস্থা বুঝতে পারলেন বেগম মুজিব। তাই কালবিলম্ব না করে ছোট ছেলে আর মেজ ছেলেকে নিয়ে পাঁচিল উপকে প্রতিবেশী ডাক্তার সাহেবের বাড়ী আশ্রয় নিলেন। অন্যদিকে বড় ছেলে কামাল এবং মহিউদ্দিন সাহেব পালালেন অন্যদিকের পাঁচিল ডিঙ্গিয়ে। রাত এগারোটা থেকেই তোপদাগার শব্দে কানে তালা লাগার জোগাড়। কতকটা চেতন কতকটা অচেতন অবস্থায় বেগম মুজিব ২৬শে মার্চের সেই ভয়াবহ রাতে শুনলেন তার আদরের বাড়ী বিধ্বস্ত হবার শব্দ। রাত এগারোটা থেকে ভোর পাঁচটা পর্যন্ত একইভাবে তারা বিধ্বস্ত করে বাড়ীটাকে। সে রাতে ওভাবে না পালালে তার এবং তার সন্তানদের ভাগ্যে কি যে ঘটতো আজও তিনি তা ভাবতে পারেন না।

২৭ তারিখ সকালে বাচ্চা দুটো সাথে নিয়ে তিনি আবার পালালেন। পুরো দেড় মাস এবাসা ওবাসা করেন। শেষে মগবাজারের এক বাসা থেকে পাক বাহিনী তাকে ১৮নং রোডে এই বাসাটাতে নিয়ে আসে।

১৮ নং রোডে আসবার পূর্বেকার মুহূর্তটাকে স্মরণ করে গম্ভীর হয়ে গেলেন বেগম মুজিব। বললেন – ‘আমি তখন মগবাজারের একটা বাসায় থাকি। আমার বড় মেয়ে হাসিনা তখন অন্তঃসত্ত্বা। সে, জামাই, আমার দেওর, জা, মেয়ে রেহেনা, পুত্র রাসেলসহ বেশ কয়েকজন এক সাথে ছিলাম মগবাজারের বাসাটাতে। হঠাৎ একদিন পাক-বাহিনী ঘেরাও করে ফেললো বাসাটা। একজন অফিসার আমাকে জানালো যে আমাকে  তাদের তত্ত্বাবধানে অন্যত্র যেতে হবে। জানি না কিভাবে ঠিক সেই মুহূর্তটাতে ভীষণ সাহসী হয়েছিলাম আমি। কড়াভাবেই সেই অফিসারকে বললাম, লিখিত কোন আদেশপত্র না দেখালে আমি একপাও বাড়বো না। উত্তরে সে উদ্ধতভাবে জানালেন যে ভালভাবে তাদের সাথে না গেলে তারা অন্য পন্থা গ্রহণ করবে। তখন বাধ্য হয়ে আমি তাদের বললাম যে আমার মগবাজার বাসায় যারা আছেন তাদের প্রত্যেককে আমার সাথে থাকতে দিতে হবে। আমার কথায় তারা নিজেরা কি যেন আলোচনা করলো, পরে তারা রাজী হয়ে নিয়ে এলো আমাদেরকে আঠার নম্বর রোডের এই বাসাটাতে’।

১৮নং রোডে আসার প্রথমদিনের কথা বলতে গিয়ে আবার হেসে ফেললেন বেগম মুজিব। ময়লা আবর্জনাপূর্ণ এই বাড়ীটাতে তখন বসবার মত কোন আসবাবপত্র দূরে থাক একটা মাদূর পর্যন্ত ছিল না। জানালার পাশ ঘেঁষা তিন-চার ইঞ্চি প্রশস্ত একফালি জায়গায় ঘেঁষাঘেষি করে বসেছিলেন তিনি এবং পরিবারের সমস্ত সদস্য।

বেগম মুজিবের বিষাদঘন দিনগুলোর কয়েকটি কথা (পৃষ্ঠা-১)

অন্তঃসত্ত্বা মেয়েকে এভাবে কষ্ট করে বসে থাকতে দেখে সেদিন বুক ফেটে যাচ্ছিল তার। মুখ ফুটে কিছু বলতে পারেননি শুধু অসহায়ভাবে তাকাচ্ছিলেন চারদিক। হয়ত অসহায়ের করুণ ডাক আল্লাহতালা সেদিন শুনেছিলেন। প্রহরী পাক-বাহিনীর একজন পাঠান অফিসার অনুভব করেছিল তার অসহায় অবস্থাকে। সেই অফিসার একজন ঝাড়ুদার সংগ্রহ করে পরিষ্কার করে দেয় ঘরদুয়ার- সংগ্রহ করে দিয়েছিল কয়েকটি চেয়ার এবং একটি কম্বল। বন্দী জীবনের নৃশংস পাক-পাহারাদার বাহিনীর মধ্যে এই অফিসারটিই ছিলেন কিছুটা ব্যতিক্রম।

ধানমন্ডির এই বাড়ীটার মাঝে অনেক দুঃখ দৈন্যের স্মৃতি চিরদিনের মত বেগম মুজিবের বুকে আঁকা হয়ে গেছে – তবুও এই বাসাতেই তিনি তার প্রথম আদরের নাতীকে বুকে নিতে পেরেছিলেন – ও স্মৃতি তার কাছে কম উজ্জ্বল নয়।

বন্দী জীবনের শত দুঃখের স্মৃতি বুকে নিয়ে বেগম মুজিব আজও সেই আঠার নম্বর রোডের দুর্গ বাড়ীতে অবস্থান করছেন। তবে আজ সেই অবরুদ্ধ বাড়ীর আঁধার-কালো পরিবেশকে খান খান করে দিয়েছে মুক্ত বাংলার স্বচ্ছ আলোকবহ্নি। দেখলাম নারায়নগঞ্জ থেকে আগত একদল আলোক সৈনিক এসেছে বেগম মুজিবকে শ্রদ্ধা জানাতে। ওদের দীপ্ত চাহনী উচ্ছল হাসিতরঙ্গ নতুন করে যেনো ঘোষণা করছে – নতুন আলোর বারতা।

বেগম মুজিবের বিষাদঘন দিনগুলোর কয়েকটি কথা (পৃষ্ঠা-২)

পত্রিকার জন্য কৃতজ্ঞতা: Center for Bangladesh Genocide Research (CBGR) এবং International Crimes Strategy Forum (ICSF)।

Leave a Reply