এপ্রিলের একটি দিন ১৯৭১ (দৈনিক বাংলা, ০৪ জানুয়ারি, ১৯৭২)

ফজল শাহাবুদ্দীন

 

সবাই এখন আছি মৃত্যুলোকে নিমজ্জিত

কখন উঠবে বেজে শেষ ঘন্টা অকস্মাৎ, কেউ

জানি না তা

 

প্রতিদিন বিশাল নতুন সূর্য

নিয়ে আসে নবতর মৃত্যুবার্তা আর

কালো কফিনের মতো অন্ধকার প্রতিটি সূর্যাস্তে

নামে বীভৎস নিষ্ঠুরতা

নতুন আঙ্গিকে

 

আমাদের গৃহকোণে গ্রামে গঞ্জে ঘাটে

হাটে বাজারে সম্পন্ন বিস্তারে

দুপুরের রৌদ্রাভ আকাশ জুড়ে শস্যক্ষেত্রে

প্রাণবন্ত সবুজ প্লাবনে

পাঞ্জাবী পশুর দল

যেন অগুণতি রক্তলোভী উম্মত্ত রবোট

জল্লাদের মতো ছুটোছুটি করে

বাংলাদেশে নামে হত্যাযজ্ঞে

প্রতিদিন প্রতি রাত্রে প্রত্যুষে সন্ধ্যায়

 

কার্ফুঘেরা ক্লান্ত ঘরে শ্বাসরোধ করা ব্ল্যাকাউটে

কলজেটা ছিঁড়ে নেয় উপড়ে ফেলে চোখ

বেয়নেট বিদ্ধ করে বাঙ্গালীর বিদ্রোহী আত্ম্যায়

 

আমার অনুজ পড়ে থাকে গলিপথে

হুমড়ি খেয়ে

আমার পিতার লাশ রক্তে ভাসে এখানে ওখানে

আমার মায়ের অশ্রু সিক্ত করে উষ্ণ

বুলেটের দাগ

আমার বোনের লজ্জা

ঝুলে থাকে কড়িকাঠে নিষ্করুণ, জলে

ডোবে ঠান্ডা কলমী লতার নীচে

পুকুরের ঘাটে

 

বাংকারে বাংকারে

যেন ভয়াল স্বতীব্র প্রতিবাদে কন্ঠ তার তীক্ষ্ণ

শ্লোগানের মতো বেজে ওঠে আর্ত আত্মবলিদানে

পোড়ে গ্রাম মসজিদ শহীদ মিনার জিঞ্জিরার

নদী আর চকবাজারের

পবিত্র প্রাচীন আজানের ধ্বনি

চোখ বাঁধা হাতে রুজু ট্রাকে বাসে জীপে

দেখি অসহায় বাংলাদেশ প্রতিদিন কেঁপে ওঠে

হিজল ফুলের মতো মালা গাঁথা মৃতদেহ হয়ে

রক্তমাখা

ভেসে যায় বুড়িগঙ্গায় তিতাসে

ধানের ক্ষেতের পাশে কাশবনে শকুন কুকুর

আর চিলেদের বিক্ষুব্ধ উৎসবে

 

মাথার উপরে ওড়ে খুনী এরোপ্লেন

কুষ্টিয়ায় বোমা ফেলে

বোমা পড়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জুড়ে নবীনগরের

মেঘনায় নৌকোয় গাংচিলে

এলেমজি স্টেন আর মর্টারের ভয়ংকর শব্দ

বৈয়ে আসে অহরহ

বাংলাদেশ মিছিলের মতো বার বার কেঁপে ওঠে

নির্মম বুলেটবিদ্ধ বেয়নেটে ছিন্নভিন্ন

 

আমরা সবাই আছি নিমজ্জিত প্রেতলোকে

কখন উঠবে বেজে মৃত্যুঘন্টা অকস্মাৎ, কেউ

আমরা এখন জানি না তা

(২৯শে এপ্রিল, ১৯৭১ ইং)

এপ্রিলের একটি দিন ১৯৭১

পত্রিকার জন্য কৃতজ্ঞতা: Center for Bangladesh Genocide Research (CBGR) এবং International Crimes Strategy Forum (ICSF)।

Leave a Reply