এখন ঘরে ফেরার পালা (দৈনিক বাংলা, ০৫ জানুয়ারি, ১৯৭২)

।। তোয়াব খান ।।

এখন ঘরে ফেরার পালা। স্বাধীন বাংলাদেশের মুক্ত নগর গ্রাম জনপদ ডাক দিয়েছে তার সন্তানকে। অনেক রক্তের নদীতে অবগাহন করে বাংলার মানুষ স্বাধীনতার যে পতাকা তুলে ধরেছে অবারিত নীলিমায় তার প্রদীপ্ত সূর্যের নীচে দাঁড়িয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে বাংলার হতভাগ্য সন্তানদের যথাযোগ্য পুনর্বাসনের। পঁচিশে মার্চের সেই কাল রাত্রির পর যারা বিনা অপরাধে পৈতৃক ভিটেমাটি থেকে উৎখাত হয়ে একটু নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য সীমান্তের অপর পারে ভারতে গিয়ে শরণার্থী হতে বাধ্য হয়েছিলেন; আর যারা নিজ বাসভূমিতে দিনের পর দিন পরবাসীর মত জীবনধারণ করেছেন – এই তিন কোটি মানুষের সুষ্ঠু পুনর্বাসনের অতীব দুরূহ সমস্যা আজ আমাদের সামনে এসে দেখা দিয়েছে। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার অবশ্য শুরু থেকেই বাস্তচ্যুত শরণার্থীদের সসম্মানে ফিরিয়ে নেয়ার এবং যথাযোগ্য পুনর্বাসনের প্রতিশ্রুতি দিয়ে এসেছেন। বাংলাদেশের এক-একটি এলাকা মুক্ত হওয়ার সাথে সাথেই সেই প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়নের কাজে হাতও তারা দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী জনাব তাজউদ্দীন আহমদ এ ব্যাপারে বিভিন্ন আঞ্চলিক পরিষদের বিশেষ দায়িত্বের কথা ইতিপূর্বেই উল্লেখ করেছেন। ডিসেম্বরের প্রথম দিকে এক বিশেষ সাক্ষাৎকারেও তিনি বলেছিলেন যে শরণার্থীদের পুনর্বাসনই হবে সরকারের প্রথম কাজ। বিগত ১৬ই ডিসেম্বর দখলদার পাকিস্তানী বাহিনীর বিনাশর্তে আত্মসমর্পণের পর ২২শে ডিসেম্বর স্বাধীন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের রাজধানী মুজিব নগর থেকে ঢাকায় স্থানান্তরের সাথে সাথে সরকার শরণার্থী পুনর্বাসনের কর্মসূচী বাস্তব অবস্থার আলোকে কার্যকর করার প্রতি দৃষ্টি দিয়েছেন। কিন্তু বাংলাদেশের এইসব ছিন্নমূল মানুষের উপযুক্ত পুনর্বাসনের সমস্যা যে কত দুরুহ এবং ব্যাপক তা বলার অপেক্ষা রাখেনা। এমন কি বাংলার সাড়ে সাত কোটি মানুষের মধ্যে তিন কোটি লোকই ছিন্নমূল, এই সংখ্যা থেকেও সমস্যার ব্যাপকতা বোঝা সম্ভব নয়। বস্তুতঃপক্ষে বাংলাদেশে এমন পরিবার খুব কমই আছে যারা পাকিস্তানী জল্লাদ বাহিনীর হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি। পিন্ডির জল্লাদের দল বিগত নয় মাস যাবৎ বাংলাদেশের উপর যে তান্ডবলীলা চালিয়েছে ইতিহাসে তার কোন নজীব নেই। এই একটি কাজে ইয়াহিয়া খান তার পূর্বসুরী নাদির, চেঙ্গিজ, হিটলার সবাইকে হার মানিয়ে দিয়েছে। বিশ্ববিবেক, বিশ্বমানবতা লজ্জায় অধবদন হয়েছে। গত সোমবার বাংলাদেশ সরকারের স্বরাষ্ট্র ও পুনর্বাসন দফতরের মন্ত্রী জনাব আবু হেনা কামরুজ্জামান পাকিস্তানী দখলদার বাহিনীর ধ্বংসযজ্ঞের যে বিবরণ দিয়েছেন তাতে দেখা যায়, বাংলাদেশে ৫০ থেকে ৬০ লাখ ঘরবাড়ীয় হানাদারের দল হয় সম্পূর্নরূপে ধ্বংস করেছে আর না হয় তার সমূহ ক্ষতিসাধন করেছে। এগুলো নতুনভাবে গড়ে তুলতে হবে। প্রায় ১৪ লাখ কৃষি পরিবারের হালের গরু লাঙ্গল বা এমন কিছু নেই যা দিয়ে তারা আবার কৃষিকাজ শুরু করতে পারে। দুই লক্ষাধিক কামার, কুমার, ছুতার, মৎসজীবীকে সরবরাহ করতে হবে তাদের প্রাথমিক সরঞ্জামগুলো। এছাড়াও আছে প্রায় দুই লক্ষ দোকানী ও ব্যবসায়ী, যাদের নিজ পেশায় পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করতে হবে। শিক্ষকশিক্ষিকা, সরকারী কর্মচারী ও অন্যান্য বুদ্ধিজীবীদের পুনর্বাসনের সমস্যাও রয়েছে। জনাব কামরুজ্জামান ঠিকই বলেছেন, শরণার্থী ও ছিন্নমূল মানুষের পুনর্বাসনের সমস্যার সর্বব্যাপকতার পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশের সাড়ে সাত কোটি মানুষকেই প্রকৃতপক্ষে নতুন করে পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করতে হবে।

এক কোটি শরণার্থী এবং দুই কোটি ছিন্নমূল মানুষের পুনর্বাসনের প্রশ্নটি শুধুমাত্র নৈতিক ও মানবিক কারণেই জরুরী হয়ে দেখা দেয়নি। দেশের স্বাভাবিক অর্থনৈতিক অবস্থা পুনরুদ্ধারের স্বার্থেও এর গুরুত্ব অপরিসীম। এক কোটি মানুষ যাদের দখলদার পাকিস্তানী বাহিনী দেশ ছাড়তে বাধ্য করেছিল এবং দুই কোটি লোক যারা বাংলাদেশের মধ্যেই এক স্থান থেকে অন্য স্থানে প্রতিনিয়ত ঘুরে বেড়াতে বাধ্য হয়েছেন হানাদারদের হাত থেকে আত্মরক্ষার জন্য- এরা সকলেই ছিলেন দেশের স্বাভাবিক অর্থনৈতিক অবস্থার সাথে নানাভাবে জড়িত। বিগত নয় মাসে দখলদার বাহিনীর কর্তৃত্বাধীনে অর্থনৈতিক তৎপরতার সাথে জড়িত থাকা তাদের পক্ষে তাই স্বাভাবিকভাবেই সম্ভব ছিল না এবং বাংলাদেশের মুক্তিপাগল মানুষের কাছে সেটা কোন মতেই অভিপ্রেতও নয়। এক কঠিন অগ্নিপরীক্ষার মধ্য দিয়ে তাদের যেতে হয়েছে সেটা বাংলাদেশ সরকার এবং জনসাধারণ ভালভাবেই অবগত আছেন। জল্লাদ ইয়াহিয়ার এক বেসামরিক স্যাঙাৎ এইসব ছিন্নমূল মানুষ সম্পর্কে যে কথাটি বলেছিল এ প্রসঙ্গে শুধু তারই উল্লেখ করছি। এই স্যাঙাৎটি প্রকাশ্যে সদর্পে বলেছিল, ‘এরাই দেশে মন্বন্তর ডেকে আনছে, এদের অনাহারেই মরতে দাও। তাহলেই সম্ভবতঃ বাঙ্গালীদের কান্ডজ্ঞান হবে’। এই ব্যক্তিটি তথাকথিত কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকের চেয়ারম্যান, নাম কার্নি। বাংলার মানুষ অনাহারে থেকেছে, এক মুঠো ভাত ভাগ করে খেয়ে কাটিয়ে দিয়েছে দিনের পর দিন। এমন দিন তাদের কাছে মোটেই অপরিচিত নয় যখন গ্রীষ্মের প্রচন্ড তাপদাহে পিচগলা সড়কে দাঁড়িয়ে তাকে বাংলা মায়ের শৃঙ্খল মোচনের কথা ভাবতে হয়েছে; অবিশ্রান্ত প্রবল বর্ষণে ভিজতে ভিজতে প্রতিজ্ঞা নিতে হয়েছে স্বাধীনতার সূর্যকে মেঘমুক্ত করার। সে বন্যায় ভেসেছে, মারীতে মরেছে, শীতে ঠক ঠক করে কেঁপেছে তবুও স্বাধীনতার পতাকাকে হাতছাড়া হতে দেয়নি; নির্বাপিত হতে দেয়নি মুক্তির আলোক শিখাকে। কার্নি সাহেবের মত জল্লাদের দোসররা আজ সোনার বাংলার মাটি থেকে বিতাড়িত। এখন আমাদের ঘরে ফেরার পালা; জল্লাদ দলের সৃষ্ট ক্ষতগুলো মুছে ফেলার পালা, দেশ গড়ার পালা।

জনাব কামরুজ্জামান তিন কোটি ছিন্নমূল মানুষের সার্বিক পুনর্বাসনের পরিকল্পনা ঘোষণা করে বলেছেন, এই কাজের জন্য কমপক্ষে দুই হাজার কোটি টাকার প্রয়োজন হবে। তিনি এই আশা প্রকাশ করেছেন যে ভারত, সেভিয়েট ইউনিয়নের ন্যায় বন্ধু রাষ্ট্রসমুহ সমাজতান্ত্রিক দেশগুলি এবং দুনিয়ার শান্তিকামী মানুষ ও তাদের সরকার এই কাজে বাংলাদেশের মানুষের পাশে এসে দাঁড়াবেন। জাতিসংঘ বা অন্যান্য সংস্থার সাহায্যও এই কাজে গ্রহণ করা হবে বলে তিনি জানিয়েছেন। বস্তুতঃপক্ষে ভারত ও সোভিয়েট সরকার ইতিমধ্যেই শরণার্থী পুনর্বাসনে যথাসাধ্য সাহায্য দেওয়ার কথা ঘোষণা করেছেন।

বাংলাদেশের তিন কোটি ছিন্নমূল মানুষের দুরূহ পুনর্বাসন সমস্যা ও তার সমাধানের কাজে হাত দেওয়ার সাথে সাথে একটি কথা আমাদের মনে রাখতে হবে যে পুনর্বাসনের প্রশ্নটি সামগ্রিকভাবে দেশের অর্থনৈতিক ব্যবস্থা পুনর্বিন্যাস ও পুনর্গঠনের সাথে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। তাই শরণার্থী পুনর্বাসনের কর্মসূচী এমনভাবে গ্রহণ করাই বাঞ্চনীয় যাতে তা আমাদের বিঘোষিত শোষণমুক্ত সমাজ গঠনের পক্ষে সহায়ক হয়। শরণার্থী তথা ছিন্নমূল মানুষেরা দেশের স্বাভাবিক অর্থনৈতিক অবস্থা তথা উৎপাদন ব্যবস্থায় নিজেদের যথাযোগ্য স্থান নেবেন এটা তাদের মৌলিক অধিকার। কিন্তু অবশ্যই আমাদের নতুন সমাজ গড়ার পথে বঙ্গবন্ধু নির্দেশিত ধর্মনিরপেক্ষতা, গণতন্ত্র ও সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতির সাথে তা সঙ্গতিপূর্ণ হতে হবে। এ জন্য পুনর্বাসন কর্মসূচী প্রণয়ন এবং তার বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সকলকে এগুতে হবে অত্যন্ত বিচক্ষণতার সাথে। কারণ শুরুতেই কোন প্রকার গোঁজামিল বা অসঙ্গতি আমাদের বিপ্লবী সরকারের কাছে কোন মতেই অভিপ্রেত হতে পারে না।

বাংলাদেশ যেহেতু একটি কৃষি প্রধান ও কৃষি নির্ভর দেশ সেহেতু শরণার্থী পুনর্বাসনের সাথে কৃষি ব্যবস্থাও জড়িত রয়েছে নানা দিক দিয়ে। সরকারও যে এ ব্যাপারে যথেষ্ট সচেতন তা জনাব কামরুজ্জামানের বক্তব্য থেকেও সুস্পষ্ট বোঝা যায়। সর্বোপরি গ্রামাঞ্চলের পিন্ডির জল্লাদ দলের এক শ্রেনীর দালাল শরণার্থীদের জমি-জমা দখলদার বাহিনীর প্রত্যক্ষ সহায়তায় নিজেদের ভোগদখলে নিয়ে এসেছে। সারা দেশের সকল মানুষের সাথে সরকারও এদের ব্যাপারে অত্যন্ত কঠোর মনোভাব ব্যক্ত করেছে। এই জাতীয় জমি হস্তান্তর বা নিলাম-খরিদ সরকার ইতিমধ্যেই বাতিল ঘোষণা করেছেন। এই অবস্থার প্রেক্ষিতে আমাদের এ সম্পর্কে অত্যন্ত সচেতন ও সতর্ক থাকতে হবে যাতে টাউট, দালাল বা ধর্মান্ধ কোন দল বা ব্যক্তি গ্রামাঞ্চলে স্বাভাবিক অবস্থা ক্ষুন্ন করতে না পারে। এই লক্ষ্যকে সামনে রেখে অর্থাৎ পুনর্বাসন বা কৃষি ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন সাধনের উদ্দেশ্যে গ্রামাঞ্চলে বাংলাদেশের মহান বিপ্লবের সমর্থক সমস্ত গণতান্ত্রিক শক্তিকে বিভিন্ন সংস্থার মাধ্যমে একত্রিত করার উদ্যোগ নিতে হবে। সরকারের বৈপ্লবিক কার্যক্রম বাস্তবায়নে এই সংস্থাসমূহ জনসাধারণের সক্রিয় সহযোগিতায় অত্যন্ত ফলপ্রসূ ভূমিকা পালন করতে সক্ষম হবে।

ছিন্নমূল মানুষের পুনর্বাসনের যে সমস্যা আজ বাংলাদেশ সরকারের সামনে উপস্থিত সত্যি কথা বলতে কি ইতিপূর্বে ঠিক এই ধরনের সমস্যা আর কোন দেশের দেখা দিয়েছে কিনা সন্দেহ; বিশেষতঃ একটি সদ্য প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্রের বেলা তো নয়ই। তাই এই সমস্যার ব্যাপকতার কথা মনে রেখেই পুনর্বাসনের কাজে বলিষ্ঠ কর্মসূচী নিয়ে অগ্রসর হতে হবে সরকারকে।

জনাব কামরুজ্জামান শরণার্থী পুনর্বাসনের জন্য দুটি পৃথক সংস্থা স্থাপন করা হবে বলে জানিয়েছেন। এ সংস্থা দুটো প্রধানতঃ পুনর্বাসনের কর্মসূচী দুদিক দিয়ে কার্যকর করবে। কিন্তু পুনর্বাসনের মূলনীতির প্রতি আরো গভীরভাবে দৃষ্টি দেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে মনে হয়। এ ব্যাপারে দুটি মূলনীতি একটু বিবেচনা করে দেখা দরকার। প্রথমতঃ দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ বিধ্বস্ত  ইউরোপের পুনর্গঠন কর্মসূচীর কথা স্মরণ রেখে আমরা অগ্রসর হতে পারি। কিন্তু এ জাতীয় কর্মসূচীতে বিস্তর অর্থের প্রয়োজন। এবং ক্ষতিগ্রস্ত সাধারণ মানুষকে তা দিতে হবে ঋণ বা সাহায্য হিসেবে অকাতরে। সেই ধরনের আর্থিক সঙ্গতি বা অবস্থা কোনটাই আমাদের আছে কি? অন্য যে পথটি বাকি থাকে তা হলো সমবায় বা অনুরূপ কর্মসূচীর পথ। গ্রামের কৃষক ও অন্যান্য মেহনতি মানুষের সার্বিক পুনর্বাসনের ক্ষেত্রে এটা এক নতুন দিগন্ত উন্মোচিত করতে পারে, আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ম্যানিফেস্টো বাস্তবায়নে যথেষ্ট সহায়কও হতে পারে।

এখন ঘরে ফেরার পালা

পত্রিকার জন্য কৃতজ্ঞতা: Center for Bangladesh Genocide Research (CBGR) এবং International Crimes Strategy Forum (ICSF)।

Leave a Reply